নিজস্ব প্রতিবেদক:
ফাইল ফটো
গত তিন মাসে মোবাইল ফোনের উৎপাদন কমেছে সাড়ে ৫ লাখ। একই সময়ে বিদেশ থেকে মোবাইল ফোনের আমদানিও নিম্নমুখী। তবু দেশের মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নতুন নতুন মডেলের স্মার্টফোন। এসব স্মার্টফোন দেশে আসছে কীভাবে?
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানিয়েছেন, অবৈধপথে ব্যাপকহারে মোবাইল ফোন দেশে ঢুকছে। ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে এসব মোবাইল আনছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই পলক অনিবন্ধিত মোবাইল ফোন বন্ধের ঘোষণা দেন। গত ১৬ জানুয়ারি তিনি জানান, জুলাইয়ের মধ্যেই অনিবন্ধিত মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চোরাইপথে মোবাইল ফোন আনার পথও বন্ধ করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণার পর ১৮ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় পরিচিতি ও নিবন্ধিত সিম কার্ডের সঙ্গে ট্যাগিং করে প্রতিটি মোবাইল ফোন নিবন্ধের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণ-প্রদান নিশ্চিত করা, অবৈধভাবে উৎপাদিত বা আমদানি করা মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টারের (এনইআইআর) কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ রূপে চালু করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের চুরি ও অবৈধ ব্যবহার রোধ হবে। এনইআইআরের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ রূপে চালু করতে শিগগিরই অবৈধ মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক হতে বিচ্ছিন্ন করা হবে। এ পরিস্থিতিতে সবাইকে মোবাইল হ্যান্ডসেট কেনার আগে বৈধতা যাচাই করে নিতে হবে।
অনিবন্ধিত মোবাইল ফোন বন্ধে কী করছে বিটিআরসি-
প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা, বিটিআরসির তোড়জোড়ে জনমনে রীতিমতো ভীতি সঞ্চার হয়। সবাই নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নিবন্ধিত নাকি অনিবন্ধিত তা জানতে মরিয়া হয়ে ওঠে। বিটিআরসির দেওয়া পদ্ধতিতে নিজের মোবাইল ফোনের বৈধতা যাচাইয়ে এসএমএস করে তথ্য জানার চেষ্টা করেন। অনেকে এসএমএস পাঠিয়ে ফিরতি এসএমএসে নিশ্চিত হয়েছেন, আবার অনেকে ফিরতি এমএসএস পাননি।
বিটিআরসি ও প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণার তিন মাস পেরিয়েছে। অনিবন্ধিত মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ কতদূর এগিয়েছে? বিটিআরসির কমিশনার প্রকৌশলী শেখ রিয়াজ আহমেদ বলেন, আমরা একটা সিস্টেম দাঁড় করাতে চেয়েছি। সেটা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। আরো সময় লাগবে।
তিনি আরো বলেন, গ্রাহকের যেন কোনো ভোগান্তি না হয়। গ্রাহক যেন কোনো ঝামেলায় না পড়েন। আমরা সেই কাজই করছি। এজন্য হুটহাট সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। তবে কাজ চলমান।
দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদন কেমন, আমদানি কত-
দেশে মোবাইল ফোনের উৎপাদন ও আমদানি নিয়ে প্রতি মাসে তথ্য প্রকাশ করে বিটিআরসি। গত ৩ মার্চ সর্বশেষ জানুয়ারি মাসের তথ্য প্রকাশ করে সংস্থাটি। বিটিআরসির প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বরে দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদন হয়েছিল ২৪ লাখ ৩২ হাজার। ডিসেম্বরে উৎপাদন হয়েছিল ২১ লাখ ১০ হাজার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেই সংখ্যা নেমেছে ১৮ লাখ ৯২ হাজারে। অর্থাৎ তিন মাসে ৫ লাখ ৪০ হাজার মোবাইল ফোন উৎপাদন কমেছে। এই সময়ে স্মার্টফোনের উৎপাদন কমেছে সবচেয়ে বেশি। গত নভেম্বরে দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের ২৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ ছিল স্মার্টফোন। জানুয়ারিতে সেই অনুপাত কমে ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে ফিচার ফোন (টু-জি) উৎপাদন বেড়েছে। নভেম্বরে ফিচার ফোনের উৎপাদনের হার ছিল ৭১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ২০ শতাংশ।
অন্যদিকে বিদেশ থেকে আমদানি করা সবই স্মার্টফোন। বিটিআরসির তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ৯ হাজার ফোর-জি এবং ১০ হাজার ফাইভ-জি স্মার্টফোন আমদানি করা হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা আরো কমেছে। ঐ মাসে মাত্র পাঁচ হাজার ৫০টি ফাইভ-জি মোবাইল ফোন আমদানি করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি ও মার্চের তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি বিটিআরসি।
চোরাইপথে আসা মোবাইল ধরা বিটিআরসির কাজ নয়-
চোরাইপথে দেশে আনা মোবাইল ফোন ধরা এবং তা বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া বিটিআরসির কাজ নয় বলেও মনে করেন সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও এনবিআরকে এসব বিষয়ে কাজ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
বিটিআরসির প্রকৌশলী শেখ রিয়াজ আহমেদের ভাষ্য, বিভিন্ন চ্যানেলে দেশে মোবাইল ফোন আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। কখনো চোরাইপথে দেশে মোবাইল ফোন আনা হয়। চোরাইপথে ফোন আসা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। আবার কখনো ভ্যাট ফাঁকি দিয়েও বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন দেশে ঢোকানো হয়। এগুলো দেখার দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। যে যার জায়গা থেকে কাজ করছে, ভূমিকা রাখছে। এটা বিটিআরসির কাজ নয়।
বিটিআরসি কী কাজ করছে? জবাবে তিনি বলেন, যে মোবাইল ফোনগুলো দেশে উৎপাদন হচ্ছে এবং বৈধপথে আমদানি করা হচ্ছে- সেগুলোর রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছি আমরা। সেগুলোর ডাটা সংগ্রহে রাখছি। এটা বিটিআরসি দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকেই করে আসছে।
মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) নেতাদের দাবি, মোবাইল ফোনের অবৈধ বাজারের কারণে দেশীয় উৎপাদন ক্রমাগতভাবে কমছে। সংগঠনটির সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, অবৈধ মোবাইল ফোনের বাজার বেশ রমরমা। ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে মোবাইল ফোন আনা হচ্ছে। চোরাইপথে আসছে। এটা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি। তা না হলে দেশীয় উৎপাদকরা আরো কোণঠাসা হয়ে পড়বেন।
দেশে আসা সব মোবাইল ফোনই এখন ‘বৈধ’-
বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধ বা বৈধভাবে আনা হোক, দেশে সক্রিয় এখন সব মোবাইল ফোনই ‘বৈধ’। এসব ফোন যদি অবৈধভাবেও দেশে আনা হয়ে থাকে, তবুও তা নিবন্ধনের আওতায় চলে এসেছে। নতুন করে নিবন্ধন করাও লাগবে না। ফলে মোবাইল হ্যান্ডসেট বৈধ নাকি অবৈধ, নেটওয়ার্কে চলবে নাকি, চলবে না- এ নিয়ে ব্যবহারকারীর কোনো দুশ্চিন্তা থাকছে না।
বিটিআরসি সূত্র জানায়, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে আসা কোনো হ্যান্ডসেটই বন্ধ হচ্ছে না। আগের মতো বিটিআরসির ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টারে (এনইআইআর) মোবাইল নেটওয়ার্কে আসা সব হ্যান্ডসেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধন হয়ে যাবে।
নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনায় উঠে আসে, মোবাইল হ্যান্ডসেট বা প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারে জনগণের কোনো ভোগান্তি হতে দেওয়া যাবে না। বিটিআরসি দেশে সচল সব হ্যান্ডসেটের বিস্তারিত ডাটাবেজ সফলভাবে রাখছে। অন্যদিকে দেশের বাইরে থেকে কোনো হ্যান্ডসেট এলে সেটির ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়ের কাজটি এনবিআরের। আর হ্যান্ডসেটটি কীভাবে এসেছে সেটি প্রয়োজন মনে করলে এনবিআর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাচাই করতে পারে।
বিটিআরসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সম্প্রতি এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান কমিশনার প্রকৌশলী শেখ রিয়াজ আহমেদ।
তিনি বলেন, নতুন সিদ্ধান্ত হয়েছে, যে মোবাইল ফোনগুলো অলরেডি নেটওয়ার্কে ঢুকে গেছে, সেগুলো অটোমেটিক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছে বলে ধরে নেয়া হবে। কোনো মোবাইলের নেটওয়ার্ক আলাদা করে বিচ্ছিন্ন করা হবে না।
সার্বিক বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, অবৈধ মোবাইল ফোনের প্রবেশ ঠেকাতে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়নে অটল রয়েছি। যে মোবাইল ফোনগুলো এখন মানুষের হাতে হাতে, সেগুলো তো হঠাৎ নৈটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। অবৈধভাবে দেশে মোবাইল ফোন আনার দায় তো ব্যবহারকারীর না। যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ থেকে আমরা পিছপা হবো না।
Leave a Reply